৫০ বছরে দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প মোজাম্বিকে

দক্ষিণ আফ্রিকার জ্বালানি সংকট নিরসনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে মোজাম্বিক।

দক্ষিণ আফ্রিকার জ্বালানি সংকট নিরসনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে মোজাম্বিক। দেশটি বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ৬০০ কোটি ডলারের মফান্দা নুকুওয়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। গত ৫০ বছরে এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্যোগ এটি। জাম্বেজি নদীর ওপর কাহোরা বাসা বাঁধের ৬০ কিলোমিটার নিচে নির্মিতব্য এ প্লান্ট ২০৩১ সালে চালু হলে দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। খবর এপি।

মোজাম্বিকের মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে এটি বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি। তবে দেশটির লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ নাগরিককে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা। বর্তমানে বিদ্যুৎ সংযোগের হার ৬০ শতাংশ, যা ২০১৮ সালে ছিল মাত্র ৩১। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ইলেকট্রিসিদাদে দে মোজাম্বিক (ইডিএম) গত বছর ৫ লাখ ৬৩ হাজার পরিবারে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছে। চলতি বছর এ সংখ্যা ছয় লাখে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে ইডিএম।

বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বলেন, ‘বিদ্যুৎ কেবল আলো নয়, এটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। মোজাম্বিক গ্যাস, জলবিদ্যুৎ ও সৌরশক্তির মতো বহুমুখী সম্পদে সমৃদ্ধ। দেশটি এরই মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম বড় বিদ্যুৎ রফতানিকারক দেখে পরিণত হতে শুরু করেছে।’

তবে মফান্দা নুকুওয়া প্রকল্প পুরোপুরি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নয়। এটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করবে ফরাসি প্রতিষ্ঠান ইলেকট্রিসিতে দে ফ্রান্স (ইডিএফ), জ্বালানি কোম্পানি টোটালএনার্জিস ও মোজাম্বিকের নিজস্ব হিদ্রোইলেকট্রিকা দে কাহোরা বাসা। বিশ্বব্যাংক দিচ্ছে আইনগত ও পরিবেশগত সহায়তার অর্থ, বিদ্যুৎ পরিবহন লাইন নির্মাণে ঋণ, আংশিক ঝুঁকি গ্যারান্টি ও রাজনৈতিক ঝুঁকি বীমা।

বাঙ্গা জানান, আফ্রিকার উন্নয়ন প্রকল্পে দাতা নির্ভরতা থেকে সরে এসে এখন বেসরকারি খাত–নেতৃত্বাধীন প্রবৃদ্ধির মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে।

প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রথমে মোজাম্বিকের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাবে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোয়ও রফতানি করা যাবে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ সংকটে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ে এ থেকে বড় উপকার পেতে পারে। বর্তমানে এ অঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে, ফলে লক্ষাধিক মানুষ এখনো বিদ্যুৎবঞ্চিত।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বিশাল ভূখণ্ডে জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণ সহজ কাজ নয়। তাই অফ-গ্রিড বা ছোট আকারের সৌর প্রকল্পকেও সমান্তরালভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ১০ শতাংশ অফ-গ্রিড থেকে আসছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও প্রশ্ন রয়েছে। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলারে। কেবল ২০২৩ সালেই ঋণ পরিশোধে খরচ হয়েছে ২১০ কোটি ডলার। বিশ্লেষকরা বলছেন, মফান্দা নুকুওয়া প্রকল্প যতটা সম্ভাবনাময়, ততটাই ঋণচাপও বাড়াতে পারে।

বিশ্বব্যাংক ও ইন্টারন্যাশনাল হাইড্রোপাওয়ার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, আফ্রিকার জলবিদ্যুৎ সক্ষমতার প্রায় ৯০ শতাংশ এখনো ব্যবহার হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ কারণে মফান্দা নুকুওয়া, কঙ্গোর ইনগা–৩ কিংবা ইথিওপিয়ার গ্র্যান্ড রেনেসাঁস বাঁধের মতো প্রকল্প আফ্রিকার বিদ্যুৎ সরবরাহ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

যদিও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, ঋণচাপ ও উত্তরাঞ্চলে চলমান বিদ্রোহের মতো চ্যালেঞ্জ এখনো বড় বাধা, তবু মোজাম্বিকবাসীর আশা নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্প তাদের জীবনে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করবে।

আরও